🏷️ মতামত

বিস্মৃতির অন্তরালে শঙ্খ ঘোষ: এক ঋষিকল্প কবির শেকড় ও আমাদের সাংস্কৃতিক দায়

📍 : বাহাউদ্দিন গোলাপ

| 📅 25 December, 2025, 7:37 pm

0Shares

বরিশালের বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীর তীরে দাঁড়ালে আজও যেন এক শান্ত, মিতভাষী মানুষের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। জলের কলতান, হিজল-তালের ছায়া আর নিস্তব্ধতার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক কবির শৈশবের স্মৃতি। সেই কবি শঙ্খ ঘোষ, যিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নৈতিকতা ও বিবেকের এক অনন্য কণ্ঠস্বর। অথচ গভীর পরিহাস হলো, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক ভিটেমাটি আজ চরম অবহেলায় পড়ে আছে।

যে মাটিতে দাঁড়িয়ে এক কিশোর বড় হয়ে উঠেছিলেন এবং পরবর্তীতে বাংলা কবিতাকে বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই বাড়িটি আজ আগাছায় ঢাকা জীর্ণ এক কাঠামো। সেখানে নেই কোনো নামফলক, নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন। বরং ঝুলছে ‘বাড়ি ভাড়া দেওয়া হইবে’ লেখা এক বিজ্ঞাপন। এটি কেবল একটি বাড়ির অবক্ষয় নয়, এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতিবোধের অবক্ষয়।

১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া চিত্তপ্রিয় ঘোষ, যিনি সাহিত্যজগতে শঙ্খ ঘোষ নামে পরিচিত, তাঁর চিন্তার বীজ রোপিত হয়েছিল বানারীপাড়ার এই আদি নিবাসেই। তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখায় বারবার ফিরে আসে বরিশালের নদী, গ্রাম, বর্ষা আর নিঃসঙ্গতার কথা। এই প্রকৃতি ও নীরবতাই গড়ে দিয়েছিল তাঁর কবিতার সংযত, গভীর ও মিতভাষী ভাষা। উচ্চকণ্ঠ না হয়েও যে কবিতা সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে পারে, শঙ্খ ঘোষ তার প্রমাণ।

দেশভাগ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এক সময়ের কবি শঙ্খ ঘোষ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ দিনগুলি রাতগুলি গ্রন্থে যেমন ছিল নাগরিক বিষণ্ণতা, তেমনি বাবরের প্রার্থনা কাব্যে এসে তা রূপ নেয় দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিবাদে। তিনি দেখিয়েছিলেন, কবিতা শুধু সৌন্দর্যের চর্চা নয়, এটি হতে পারে নৈতিক অবস্থানের ভাষা।

আজকের সময়েও শঙ্খ ঘোষ ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন চারদিকে শব্দের বাড়াবাড়ি, কৃত্রিমতা আর বিজ্ঞাপনের দাপট, তখন তাঁর কবিতা আমাদের থামতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে পঙক্তিটি আজকের সমাজের নগ্ন সত্যকে যেন আগেই বলে দিয়েছিল। অথচ দুঃখজনকভাবে, তাঁর জন্মভিটার গেটেই আজ ঝুলছে সেই বিজ্ঞাপন।

বিশ্বের নানা দেশে সাহিত্যিকদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয় গভীর শ্রদ্ধায়। শেক্সপিয়র, কাফকা বা আনা আখমাতোভার বাড়িগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, সেগুলো জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অংশ। সেখানে আমাদের দেশে শঙ্খ ঘোষের পৈতৃক ভিটার এই দশা প্রমাণ করে, আমরা এখনো আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে গুরুত্ব দিতে শিখিনি।

শঙ্খ ঘোষ আমাদের শিখিয়েছিলেন মৌনতার শক্তি। তিনি দেখিয়েছিলেন, নীরব থেকেও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো যায়। রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে বুঝতে তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। অথচ তাঁর নিজের স্মৃতির প্রতি আমরা উদাসীন।

অবিলম্বে বানারীপাড়ার এই পৈতৃক ভিটাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এখানে একটি শঙ্খ ঘোষ গবেষণা কেন্দ্র, সাহিত্য জাদুঘর কিংবা ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা যেতে পারে। এটি কেবল একজন কবির প্রতি শ্রদ্ধা নয়, এটি হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা।

যে কবি লিখেছিলেন, “ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও, আমার সন্ততি স্বপ্ন দেখুক”, আজ তাঁর সেই স্বপ্নই যেন প্রশ্নের মুখে। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি রক্ষা করা মানে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক আত্মসম্মান রক্ষা করা।

একটি জাতি যদি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শিকড় সংরক্ষণ করতে না পারে, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। বানারীপাড়ার সেই জীর্ণ দেয়ালগুলো আজ শুধু সংস্কার নয়, আমাদের বিবেকের জাগরণ দাবি করছে। শঙ্খ ঘোষের নিঃশব্দ শঙ্খধ্বনি যেন বিস্মৃতির বিরুদ্ধে আবার আমাদের চেতনায় প্রতিধ্বনিত হয়।


বাহাউদ্দিন গোলাপ
ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
b_golap@yahoo.com